সারাদেশ

আরেকটি স্বপ্ন পূরণে, খুলে দেয়া হচেছ স্বপ্নের পায়রা সেতু

প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর আজ রোববার (২৪ অক্টোবর,২০২১) খুলে দেওয়া হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত, স্বপ্নের  পায়রা সেতু।

আজ সকালে গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি পায়রা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে এক বার্তায় নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ ইসমাত মাহমুদা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেতুর দুমকী প্রান্তে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক এমপি, বরিশাল সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার সংসদ সদস্যগন, সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরী ও প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুস সবুর, শেখ হাসিনা সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল কালাম মো. জিয়াউর রহমান, বিভাগীয় কমিশনার মো. সাইফুল হাসান বাদল, ডিআইজি এসএম আক্তারুজ্জামান, পুলিশ কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান, সড়ক বিভাগ বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালসহ সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পায়রা সেতু প্রকল্প পরিচালক আবদুল হালিম এ বিষয়ে বলেন, ‘সেতু কাজ আরও আগেই শেষ হতো। কিন্তু প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতার ফলে সেতুর নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, দীর্ঘ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সময় মতো সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। তবে চলতি মাসেই মূল সেতু, সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষ হয়েছে। আগামীকাল (আজ) রোববার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যান চলাচলের জন্য খুলে যাবে এই সেতু। আর সেই সাথে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ফেরিবিহীন যান চলাচল করা যাবে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগে আরেক ধাপ এগোবে দক্ষিণাঞ্চল।’

সূত্র মতে, ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী এলাকার পায়রা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে পায়রা সেতু। রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে সেতুটির দূরত্ব ১৯২ কিলোমিটার এবং বরিশাল নগরী থেকে ২৭ কিলোমিটার।

২০১২ সালের মে মাসে সেতু নির্মাণের প্রকল্পে অনুমোদন দেয়। কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের যৌথ অর্থায়নে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটির নির্মাণকাজ করছে। ২০১৩ সালে ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা ছিল এবং ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১৩ দশমিক ২৮ কোটি টাকা।

কিন্তু নানান জটিলতায় সর্বশেষ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১১৮ কোটি।

চার লেনবিশিষ্ট সেতুটি নির্মিত হচ্ছে ‘এক্সট্রাডোজড কেবল স্টেইড’ প্রযুক্তিতে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর শাহ আমানত সেতুও এই প্রযুক্তিতে নির্মিত। ১ হাজার ৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার প্রস্থের সেতুটি কেবল দিয়ে দুই পাশে সংযুক্ত রয়েছে। ২০০ মিটার করে দেশের দীর্ঘতম দুটি স্প্যান বসানো হয়েছে পায়রা সেতুতে। নদীর তলদেশে বসানো হয়েছে ১৩০ মিটার দীর্ঘ পাইল, যা দেশের সর্ববৃহৎ। উভয় পাড়ে সাত কিলোমিটারজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে সংযোগ সড়ক। নদীর মাঝখানে মাত্র একটি পিলার ব্যবহার করা হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক থাকবে। ৩২টি স্প্যানের মূল সেতুটি বিভিন্ন মাপের ৫৫টি টেস্ট পাইলসহ ১০টি পিয়ার, পাইল ও পিয়ার ক্যাপের ওপর নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া ১৬৭টি বক্স গার্ডার সেগমেন্ট রয়েছে এ সেতুতে।

পায়রা সেতুতে ‘ব্রিজ হেলথ মনিটর’ স্থাপিত হয়েছে। যার ফলে বজ্রপাত, ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অতিরিক্ত মালামাল বোঝাই যানবাহন চলাচলে সেতুর ভাইব্রেশন সিস্টেমে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সেই বিষয়ে সংকেত দেবে। এ ছাড়া সেতুর পিলারের পাশে নিরাপত্তা পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এতে কোনো কিছুর ধাক্কায় সেতুর ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হবে, বাড়বে সেতুর স্থায়িত্ব। এই সেতুর জন্য আলাদা সাবস্টেশনের মাধ্যমে সেতুতে বিদ্যুৎ সরবরাহে বাতি জ্বলবে। থাকছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও।

জানা গেছে, সাগরকন্যা কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা মাথায় রেখে সেতুটি নান্দনিক রূপে গড়ে তোলা হয়েছে। বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে নির্মিত সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার খবরে খুশি স্থানীয়রা। কারণ পায়রা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের পথ সুগম হবে পর্যটন নগরী কুয়াকাটা, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, কোস্টগার্ডের সিজি-বেইজ অগ্রযাত্রা, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন,     ‘এক সময় সড়কপথে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা যেতে ১০টি নদীতে ফেরি পারাপার হয়ে যেত হতো। এখনো পদ্মা ও পায়রা এই দুটি নদীতে ফেরি পারাপার হতে হয়। নদী পারাপারে দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। পদ্মা সেতু অচিরেই চালু হবে। পায়রা সেতুটিও উন্মুক্ত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগে আরেক ধাপ এগোবে দক্ষিণাঞ্চল।’

বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি এসএম আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪শ’ জন আমন্ত্রিত অতিথি দুমকীপ্রান্তে উপস্থিত থাকবেন। আনন্দঘন এবং কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সমাপ্ত করার যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন।’

বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. সাইফুল হাসান বাদল বলেন, ‘এই দিনটি বরিশালবাসীর জন্য একটি স্মরণীয় দিন। এই দিনটির জন্য ৫০ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। সেতুটি উদ্বোধন হয়ে গেলে মাওয়া এবং কাঠালবাড়ি থেকে দেশের সর্ব দক্ষিণের কুয়াকাটা পর্যন্ত ফেরীবিহীন সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হবে। এতে এই অঞ্চলে যানবাহন চলাচল বাড়বে। তড়ান্বিত হবে দক্ষিণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সেতুটি ঘিরে এলাকার উন্নয়ন হবে। সেতুটি চালু হওয়ার সাথে সাথে বরিশাল অঞ্চল তথা উপকুলীয় এলাকার মানুষের অর্থনীতি উন্নয়নে সহায়ক হবে। বদলে দেবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা। সেতুটির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button