জানুয়ারি ২৬, ২০২১ ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ ||১৩ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ||১২ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করবেন না: প্রধানমন্ত্রী

ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য হুঁশিয়ারি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন: দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশের মানুষকে বিজয়ের ৪৯তম দিবসের শুভেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন: দেশে প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মের-বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। এ বাংলাদেশ লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশ শাহজালাল, শাহ পরান, শাহ মখদুম, খানজাহান আলীর বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ শেখ মুজিবের বাংলাদেশ; সাড়ে ষোল কোটি বাঙালির বাংলাদেশ। এ দেশ সকলের। এ দেশে ধর্মের নামে আমরা কোনো ধরনের বিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দিব না। ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে এ দেশের মানুষ প্রগতি, অগ্রগতি এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবেন।প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতে মহান বিজয়ের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে আজ আমরা বিজয় দিবস-২০২০ উদযাপন করতে যাচ্ছি। এ বছর আমরা আমাদের মহান নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি। কয়েকদিন পর আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পদার্পন করবো। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছি। গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলা করে সমগ্র বিশ্বের বুকে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছি। প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে দেশের দুই প্রান্তকে সংযুক্ত করেছে। পৃথিবীর বুকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রত্যয় নিয়ে দেশ এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশের সকল নাগরিককে আমি বিজয় দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, এক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ বছর আমাদের বিজয় দিবস উদ্যাপন করতে হচ্ছে। করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে আমাদের দৈনন্দিন কার্যপ্রণালীতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, জনসমাগম এড়িয়ে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম সম্পন্ন করতে হচ্ছে। প্রতিটি মানুষের জীবনই মহা মূল্যবান। কোনো অবহেলায় একজন মানুষেরও মৃত্যু কাম্য নয়। তাই আমি সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিজয় দিবস উদযাপনসহ যাবতীয় কাজকর্ম সম্পন্ন করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

তিনি আহ্বান করে বলেন, আপনারা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক পরিধান করবেন এবং মাঝে মধ্যে হাত সাবান অথবা স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করবেন। আপনার সুরক্ষা, সকলের জন্য রক্ষাকবচ।

করোনার পরিস্থিতিতে বিজয় দিবসের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  এ বছরটি শুধু আমাদের জন্যই নয়, বিশ্ববাসীর জন্য এক দুর্যোগময় বছর। করোনাভাইরাসের মহামারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনীতির উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশ্ব অর্থনীতি এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। করোনাভাইরাসের মহামারির ফলে অনেক উন্নত এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশে আমরা সময়োচিত পদক্ষেপ এবং কর্মসূচি গ্রহণ করে এই নেতিবাচক অভিঘাত কিছুটা হলেও সামাল দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি যা জিডিপি’র ৪.৩ শতাংশ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ২.৫ কোটি প্রান্তিক মানুষকে নগদসহ নানা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ধাক্কা সামলিয়ে আমাদের প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত অর্থবছরে ৫.২৪ শতাংশ হারে আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রক্ষেপণ বলছে ২০২০ সালে বাংলাদেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাঙালি জাতি শত বঞ্চনা ও কষ্টের মাঝেও কখনো মাথানত করেনি। অত্যাচার-নিপীড়ন যত বেড়েছে, বাংলার মুক্তিকামী মানুষ ততই মরিয়া হয়ে শত্রু বাহিনীর উপর প্রতি-আক্রমণ শাণিয়েছে। অবশেষে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে প্রতাপশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বাঙালি অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়। বাংলাদেশ হয় শত্রুমুক্ত। এরপর জাতির পিতা যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত, দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, তখনই পরাজিত শক্তির দোসররা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে শুধু একজন ব্যক্তি মুজিবের মহাপ্রয়াণ হয়নি। তাকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস চালানো হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির যে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছিল, তা স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। তাকে হত্যার মাধ্যমে একটি আদর্শ ও স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটানো হয়। যে স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন এ দেশের লক্ষ-কোটি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য। সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন।

About Md Uzzal