জানুয়ারি ২৬, ২০২১ ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ ||১৩ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ||১২ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

কামরাঙ্গীরচরে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নির্মাণ হচ্ছে বহুতল মার্কেট, ঘটতে পারে দুর্ঘটনা!

হানজালা শিহাব।।

সরকারের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কামরাঙ্গীরচরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন। এসব ভবন নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয় না। এমনকি রাজউকের কোনও ধরনের অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন ও মার্কেট নির্মাণের ঘটনাও ঘটছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যদিও রাজউকের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কামরাঙ্গীরচরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের  অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মান করা হচ্ছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে আলোচিত খবর। কামরাঙ্গীরচরের টেকেরহাটি প্রধান সড়কের পাশেই পাওয়া যায় এমন একটি ভবন। মদিনা টাওয়ার ও সুপার মার্কেট নামের ৬তলা বিশিষ্ট এই ভবনের পাইলিংয়ের কাজ চলছিল। ওই ভবন নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- রাজউকের কোনও অনুমোদন নেই। রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এমনকি নির্মাণাধীন ওই ভবনের মালিক হাজী মো. জাহাঙ্গীর আলমও রাজউকের অনুমোদন ছাড়া মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন মদিনা টাওয়ার ও সুপার মার্কেটের মালিক হাজী মো. জাহাঙ্গীর আলমকে প্রথমে মৌখিক ও পরে লিখিত নোটিশের মাধ্যমে নকশা/প্ল্যান অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোনের ইমারত নির্মাণ পরিদর্শক প্রণব কুমার জানান, গত ২ নভেম্বর লিখিত ওই নির্দেশনা দেয়া হয়, যার অনুলিপি কামরাঙ্গীরচর থানাকেও দেয়া হয়। রাজউক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদন পাস না করানো পর্যন্ত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন হাজী জাহাঙ্গীর। কিন্তু  বাস্তবতা হচ্ছে পুরো উল্টো।  প্রথম বারের  প্রায় একমাস পরও  আবার গিয়ে দেখা যায় ওই মার্কেট নির্মাণের কাজ পুরো দমে চলছে। এরই মধ্যে ভবনের বেইজমেন্ট ও প্রথম তলার ছাদ নির্মাণ শেষ হয়েছে। এখন দ্বিতীয় তলার ছাদ নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে রাজউকের কামরাঙ্গীরচর জোনের পরিদর্শক প্রণব কুমারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের ক্ষমতা সীমিত। আমি চাইলে অবৈধভাবে নির্মিত ভবন ভেঙ্গে দিতে পারি না। আমার ক্ষমতা আছে নোটিশ করার। প্রথম নোটিশের পর কাজ বন্ধ না করলে দ্বিতীয়বার নোটিশ করবো। এরপরও কাজ বন্ধ না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে উচ্ছেদ করার ব্যবস্থা নিতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় এমন হয় যে, কাজ বন্ধ রাখার জন্য নোটিশ করতে গেলে ছেলেপেলে জড়ো হয়ে আমাকেই হেনস্থা করতে উদ্ধ্যাত হয়। তখন নিরূপায় হয়ে অপমাণ সহ্য করে ফিরে আসতে হয়।’ প্রণব বলেন, ‘মদিনা টাওয়ারের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে ও প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন মালিককে দেয়া নোটিশের অনুলিপি কামরাঙ্গীরচর থানার ওসিকে দিয়েছি। পুলিশ চাইলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।’ কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘থানায় একটি অনুলিপি দেয়া হয়েছে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। নির্মাণ কাজ বন্ধ করা- এটি আমাদের কাজ নয়। এটি রাজউকের কাজ। তারপরেও যদি ওসি বরাবরে রাজউক চিঠি পাঠায় তখন পুলিশ সেটি দেখবে।’ রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোন কর্মকর্তা মো. নাজমুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর জাহাঙ্গীর সাহেবকে ডাকা হয়েছিল। ওনি এসে কাজ বন্ধ রাখার কথা বলে গেছেন। অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে তাকে মৌখিক ও লিখিত নোটিশ করা হয়েছে।’ কিন্তু নির্মাণ কাজ চলমান থাকার বিষয়টি তাকে অবহিত করা হলে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয়বার নোটিশ করা হবে।’সঙ্গে যোগ করেন সীমিত জনবল দিয়ে প্রতিনিয়ত রাজধানীতে গড়ে ওঠা শত শত বহুতল ভবন সঠিকভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হয় না। এই সুযোগে কিছু অসাধু মানুষ সরকারের আইন-কানুন উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণ করে ।

নির্ভরযোগ্যে সূত্রে জানা গেছে, কামরাঙ্গীরচর ইউনিয়ন পরিষদ থাকাকালীন অন্তত ৭/৮ বছর আগে ওই জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি প্ল্যান পাস করানো হয়েছিল। কিন্তু এরপর কামরাঙ্গীরচর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন আসে ২০১৩ সালে। নতুন করে ওই এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের অনুমোদন নেয়া এখন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই আইন লঙ্ঘন করে মদিনা টাওয়া ও সুপার মার্কেট নামে বহুতল ভবনটি নির্মাণ করছেন হাজী জাহাঙ্গীর আলম। বিষয়টি তিনি স্বীকারও করেছেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনে। যার রেকর্ড আমাদের হাতে রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ কাঠা জমির উপর নির্মাণাধীন ওই ভবনের মালিক হাজী মো. জাহাঙ্গীর আলম একজন ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন। তাছাড়া ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বিদেশ থেকে অবৈধ পণ্য এনে পোর্টে ধরা পড়ায় চট্টগ্রাম বন্ধরে সেই পণ্য আটকে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে রাজউকের কোনও ধরনের অনুমোদন ছাড়া মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে ভবনের মালিকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্টো প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আশপাশের ভবন নির্মাণ কি আইন মেনে হয়েছে? সেগুলো আপনারা দেখেন না?’ আর তার বিরুদ্ধে আদালতে বিচারাধীন মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘সেটি আদালতেই প্রমাণ হবে।’

 

About Md Uzzal