August 24, 2019 6:26 AM

শাবান মাসের ফজিলত ও করনীয়  

শাবান চন্দ্র বছরের অষ্টম মাস । এ মাসের আনেক ফযীলত বর্ণিত রয়েছে । এ মাসটিতে বরকত দানের জন্য রাসূলুল্লাহু সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দরবার মুনাজাত করেছেন । হাদীসের কিতাবাদীতে উল্লেখ রয়েছে, রজব মাস শুরু হলেই নবীজি বেশি  বেশি করে দুয়া করতেন, আল্লা-হুমা বা-রিক লানাফী রাজাবা ওয়া শাবান , ওয়া বাল্লিগনা রামাদ্বান । অর্থঃ হেআল্লাহ । রজব ও শাবান মাসে আমাদের জন্য বরকত দান করো । আর আমাদেরকে রামদ্বান পর্যন্ত পৌছাও । এ মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে এমাসে বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে কাবার দিকে কিবলাহ পরিবর্তন হয়েছে । শাবান মাসে মুমিনগণের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ নাযিল হয়েছে হে ঈমানদারগণ তোমার নবীর উপর দুরূদ পড়আর যতাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাকে সালাম জানাও । এ কারনে উলামাগণ শাবানকে বেশী করে দুরূদ ও সালাম পেশ করার মাস বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন । সহীহ হাদিসের ভাষ্যমতে নবীজি প্রায় পুরো শাবান মাশ রোজা রাখতেন । মূলতঃ শাবান মাস হচ্ছে পবিত্র বামাদ্বান মাসের প্রস্তুতি গ্রহনের মাস । পুরো শাবান মাস জুড়ে বেশী বেশী নফল ইবাদাত বন্দেগি করে নিজেকে মাহে বামাদ্বানের অফুরন্ত নিয়ামত ওবরকত লাভের যোগ্য করে তুলতে হবে ।
হযরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন মহানবী সাঃ ইরশাদ করেছেন, শাবান আমার মাস, রজব আল্লাহর মাস এবং রামাদ্বান আমার উম্মতের মাস । শাবান মানুষকে গুনাহ হে দূরে রাখে এবং রামাদ্বান মানুষকে গুনাহ হতেপূত পবিত্র রাখে । মহানবী (সাঃ) আরো ইরশাদ করেছেন, এ মাসে মানুষের আমল সমূহ আল্লাহ তায়ালার নিকট পৌছানো হয় । এ জন্য আমি চাই রোজাদার অবস্থায় আমার আমলনামা আল্লাহ তায়ালার দরবারে পৌছানো হোক । হযরত আনাস ইবনে মালিক রাঃ হতে বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাঃ ইরশাদ করেছেন, রজব মাস অন্যান্য মাসের উপর এমন মর্যাদা রাখে যেমন কুরআন শরিফ অন্যান্য গ্রন্তের উপর মর্যাদা রাখে । গুনিয়াতুত তলেবীন ।
সুতরাং প্রত্যেক মুমিন বান্দাবান্দীর কর্তব্য হচ্ছে শাবান মাসে গাফলতি না করে রামাদ্বান মাসকে স্বাগত জানাতে এ মাসে যেন প্রস্তুতি গ্রহন করে ।

মহিমান্নিত শবেবরাত

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত হচ্ছে একটি বিশেষ বরকতপূর্ণ রাত । হাদীস শরীফের ভাষায় ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান । আর আমাদের দেশীয় পরিভাষায় এ রাতকে “শবেবরাত” নামে অভিহিত করা হয় । উলামায়ে কেরাম বলেন, এ রাতের বিশ এরও অধিক নাম রয়েছে । তন্মধ্যে লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুর রাহমাহ, লইলাতুস সাক ইত্যাদি।
কুরআনের আলোকে শবেবরাত
আললাহপাক কুরআনে করীমে ইরশাদ করেন ‘হা মীম । এই সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ । নিশ্চয় আমি কুরআন নাযীল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী । উক্ত রাতে ফয়সালা করা হয় প্রতিটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন বিষয়ের । (সূরা দোখানঃ ১-৪) ।
এ আয়াতের তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রাঃ) সর অধিক সংখ্যক মুফাসসির এর মতে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ দ্বারা লাইলাতুল ক্বদর বঝানো হয়েছে । কিন্তু হযরত ইকরামা (রাঃ) সহ অপর মুফাসসিরগন লাইলাতুলমুবারাকা, শব্দের অর্থ নিছফে শাবানের রাত অর্থাৎ বরাতের রাত বলে মনে করেন । এই আয়াতের তাফসীরে বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে নিরংকুশভাবে কেবল শবেবরাত প্রমাণিত না হলেও হাদিস শরীফে প্রায় ত্রিশজন সাহাবায়ে কেরাম থেকে ,লাইলাতুম মিন নিছফে শাবান , বা শবেবরাত প্রসঙ্গে অনেকগুলো হাদিস রয়েছে । শবেক্বদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম ও মহিমান্বিত । আর শবেক্বদরের পর যে শবেবরাতের স্থান তা হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত । অন্য কোন রাতের মর্যাদা বর্ণনায় এত অধিক য়ংখ্যক হাদিস পাওয়া যায় না ।

হাদিসের আলোকে শবেবরাত

v হাদিস শরিফে উল্লেখরয়েছে যে, ‘শবেবরাতে আল্লাহ পাক তাঁর সৃষ্টি কুলের প্রতি রহমতের নজরে তাকান । আর মুশরিক ও অন্যের প্রতি হিংসা পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন । এ হাদিস বিভিন্ন সূত্রে আটজন সাহাবী থেকে বর্ণত রয়েছে । তাঁর হলেন হযরত আবু বকর সিদদিক, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত আবু মূসা আশআরী, হযরত আউফ বিন মালিক, হযরত আমর ইবনুল আস, হযরত আবু সা’লাবা আল খুসানি (রাঃ) সনদের দিক থেকে এ হাদিসটি সহীহ । ইমাম ইবনু হিব্বান তাঁর ‘সহীহ ইবনু হিব্বান, এ হদিসটি উল্লেখ করেছেন (পৃষ্ঠা-১৫১৪) ।
সালাফিগণের দৃষ্টিতে ইসলামে হাদিসের খ্যাতিমান পন্ডিত শায়খ নাসিরুদদীন আলবানী (ওফাতঃ১৪২০ হিজরী) সিলসিলাতুল আহাদদিসিস সহীহা, নামক কিতাবে (খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৩৫, হাদিস নম্বর ১১১৪) এ হাদিস উল্লেখ করে বলেছেন, এ হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহীহ ।
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন, পাচটি রাতে দোয়া ফেরত দেয়া হয় না । (আথ্যাৎ এ রাতগুলোর দোয়া কবুল হয়) রাতগুলো হলো জুমাআর রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত (শবেবরাত) ও দুই ঈদের রাত ।
(সূত্রঃ মুসান্নাফে আবদুর রাযযক, খন্ড ৪ পষ্ঠা ৩১৭) তাবিঈ আতা বিন ইয়াসার (রাঃ) বলেন, শবে ক্বদরের পর শবে বরাতের চেয়ে বেশি ফযীলতপূণর্ আর কোন রাত নেই ।
(সূত্রঃ

আততারগীব ওয়াততারহিক কিতাবে মুয়াজ ইবনে যাবাল (রাঃ) এর হাদিসটি ছাড়াও আরো কয়েকটি হাদিস এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন । হযরত আয়েশা (রাঃ) এর হাদিস থেকে ইমাম বায়হাকী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, জিবরাঈল আঃ আমার কাছে আগমন করলেন, অতঃপর বললেন ইহা অর্ধ শাবানের রাত । এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বনি কলব গোত্রের মেষ পালের পশমের সংখ্যা তুল্য অসংখ্য মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন । এবং আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রে মুশরিক, হিংসুক, রক্ত সম্পর্কিত আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, ঘন্টার নীচ কাপড় ব্যবহারকারী পুরুষ, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান এবং মধ্যপায়ীদের প্রতি তাকাবেন না । হাদিসটি ইমাম বায়হাকী (রাঃ) শুয়াবুল ঈমান নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন।
একই কিতবে হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিস উল্লেখ করা হয়াছে । নবী করিম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসবে তখন তোমরা ঐ রাত জাগে এবাদত কর এবং এর পর দিন রোজা রাখ । কেননা আল্লাহ তায়ালা রাতে সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আসমানে আবিভূত হন । অতঃপর আহবান করেন তোমাদের মধ্যে কোন ক্ষমা প্রর্থনাকারী আছে কি ? যাকে আমি মাফ করে দিব । রিজিকের জন্য কোন প্রর্থনাকারী আছে কি ? যাকে আমি রিজেক দিব । কোন বিপদগ্রস্ত কেউ আছে কি ? যাকে আমি বিপদ থেকে মুক্তি দিব । এমনি করে আরও বান্দাদের সম্বোধন করে ডাকতে থাকবেন । আর এমতাবন্থায় সুবহে সাদীক হয়ে যাবে । হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন । এ ছাড়াও দুনিয়া ব্যপি বহুল পরিচিত ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাব, মিশকাতুল মাছাবীহ এর ”বাবু কিয়ামী শাহরে রামাদ্বান অধ্যায়ে লাইলাতুল বারাকা এর ফযীলত প্রসঙ্গে মোট চারটি হাদিস এসেছে তন্মধ্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দুইটি হাদিস রয়েছে । যার কাছ থেকে আমরা হুজুর পাক (সাঃ) এর রাত্রিকালীন বিভিন্ন আমলের বর্ণনা পাই । উমহাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত হাদিস বিশেষজ্ঞ শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রাহঃ) তাঁর ”মা ছাবাতা বিসসুন্নাহ ফি আইয়ামিছ ছানাহ” কিতাবে শব্বরাতের ফযীলত এবং এ রাতে ইবাদত বন্দেগী সম্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ন হাদিসের উল্লেখ করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ।
সাহাবা ও তিবিঈ যুগের পর চার মাজহাবের মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম এমনকি মাযহাব অমান্যকারী উলামায়ে কেরামের মধ্যে অনেকে শবে বরাতের ফযীলত স্বীকার করেন।
শবেবরাতে বিশেষভাবে নফল এবাদত বন্দেগী করার জন্য তাঁরা মানুষকে উৎসাহিত করেছেন । ইমাম শাফিঈ (রাহঃ) বলেন, পাঁচ রাতে দোয়া কবুল হয় । জুমুআর রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত (শবেবরাত) ও দুই ঈদের রাত ।
(সূত্রঃ কিতাবুল উম্মা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা১৩১ )
যে ইবনে তাইমিয়ার কথা দিয়ে সালাফীগণ দলীল পেশ করেন, সেই ইবনে তাইমিয়া শবেবরাত সম্পর্কে বলেন, ”শবেবরাতের ফযীলত বিষয়ে অনেকে মারফু” হাদিস ও আছার সাহাবা তাবিঈগনের অভিমত বর্ণিত রয়েছে । যেগুলো প্রমান করে যে, ইহা একটি মর্যাদাবান রাত । সালাফ সালিহীনগণ এ রাতকে নফল নামাযের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখেন । আর শা’বান মাসের রোযার ফযীলত বিষয়ে সহীহ হাদীস রয়েছে ।
(সূত্রঃ ইকতিদাউ সিরাতিল মুসতাকীম পৃষ্ঠা ৩০১)
উল্লেখ্য শবে বরাত প্রসঙ্গে বিভিন্ন হাদীসের কিতাবে উল্লেখিত হাদীসগুলোতে সহীহ, হাছান ও দ্বায়ীফ তিন প্রকারেরই হাদীস রয়েছে । দ্বীয়ীফ হাদীসের দোহাই দিয়ে যারা শবে বরাতকে অস্বীকার করতে চান, তাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, সকল মাজহাবের উলামা ও মুহাদ্দিসগন এব্যপারে একমত যে, দ্বয়ীফ হাদীস আমালের ফযীলতে ব্যবহার করা যায় এবং এর ভিত্তিতে মুস্তাহাব আমল করতে কোন বাঁধা নেই ।
উপরোল্লিখিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে, যারা শবেবরাতের ফযীলত অস্বীকার করেন, যারা বলেন শবেবরাত উদযাপন করা ঠিক নয়, তাদের এসব কথা ভুল এবং ভিত্তিহীন ।
তাই আসুন, সলফে সালিহীনের অনুসরণে আমরা যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদার সাথে শবেবরাত উদযাপন করি ।
শবেবরাতের আমল
#এ রাতের শুরুতে আল্লাহর দরবারে তাওবা করে নেবেন ।এ রাতে বেশী করে নফল নামায পড়বেন ।
# এ রাতে যে যতটুকু পারেন বেশী করে কুরআন তিলাওয়াত করবেন ।
# এ রাতে নিজের জন্য, আত্মীয়-স্বজন ও সকল মুমিন মুসলমানের জন্য মাগফিরাতের দুআ করবেন ।
# এ রাতে বেশী বেশী করে ইসতিগফার ওদুরূদ শরীফ পড়বেন ।
# এ রাতে সম্ভবমতো মুমিন মুসলমানের কবর যিয়ারত করবেন ।
# পরবর্তী দিন নফল রোযা রাখবেন ।

সূত্রঃ

  1. কুরআনুল কারিম (সূরা দোখানঃ ১-৪)
  2. সহীহ তিরমিযী।
  3. সহীহ ইবনে হিব্বান।
  4. মিশকাতুল মাসাবীহ।
  5. কিতাবুল উম্মা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা১৩১।
  6. লাতাইফুল মাআরিফা, পষ্ঠা১৯১
  7. ইকতিদাউ সিরাতিল মুসতাকীম পৃষ্ঠা ৩০১
  8. শুয়াবুল ঈমান লেখক : মাওলানা মুহাম্মদ ছাইফুর রহমান ছাইদী

    (বি.এ.অনার্স এম.এ.হাদীস)

About